ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন | সৌম্যজিৎ




| |                         বর্ণব্যথামালা | সৌম্যজিৎ চক্রবর্তী




[চিত্রণ: নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, শান্তিনিকেতন]

স্বরব্যথা ---
অ -- অঞ্জন দত্ত। যদি ‘বাপি আর মা..গ্যাছে সিনেমা, তুমি একা’ গানটা না লিখতেন, ব্যথা যে ঠিক কোথায় কিভাবে হয়, বোঝা হতো না। বেনেপুকুরের এই লোকটা আমায় একটা ব্যথাদরের ছেলেবেলা দিয়েছে। 
আ -- আকাশ। আমার প্রথম সখা, একমাত্র যাকে বোঝাতে পেরেছি যে- আমি মানুষটা আদপে মন্দ নই। আজকাল আরও কাছাকাছি যেতে ইচ্ছে হয়। বুকে ধরে, আগলে রাখতে মন হয়। নিজেকে মধ্যে মধ্যে মায়ের মতন লাগে। আকাশের মা।
ই -- ই(এক) – ইহজন্মে অনেক কিছু করা হলনা, দেখা হলনা। তাই পরজন্মের প্রতি বিশ্বাস বেড়ে যাচ্ছে বাপ বাপ ব’লে। ইহজন্মের সাথে একপ্রকার সমঝোতা করে নিয়েছি। যেটুকু পারছি, রেখে যাচ্ছি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।
    ই(দুই) – ইনকা, আমার একমাত্র মেয়ে। ইনকা, এখন বেসরকারী প্রতিবেদন লেখে সরকারী কায়দায়। ও, কক্সবাজারের চা-ওয়ালী হতে চেয়েছিল। কুণ্ডলী পাকিয়ে সেই রাতটুকু আমার কপালের নীচে শুয়েছিল।
ঈ -- ঈষৎ উষ্ণ সিগারেটের ছাই কখনো আঙুলে মেখে দেখেছ? দেখো। মনে হবে, শ্মশানযাত্রীদের সাথে দেখা হয়েছিল। মেলার মাঠে, তুমিও ভেঁপু বাজিয়েছিলে, কোনো এক ঈ-সৎ উষ্ণ ঠোঁটে।
উ -- উটের পিঠে জটায়ু। নিজে উঠে বুঝেছিলাম, কি সাংঘাতিক ব্যাপার সেটা! পোখরানে বাস থেকে নেমে ভোর চারটেয় পেল্লাই কাঁচ-গেলাসে উটের দুধের চা। একটা বুনো গন্ধ মানুষের ঠোঁট থেকে এখনো মুছে যায়নি।
ঊ -- ঊঢ়-ঊঢ়া ঊঢ়ি করল না। ব্যথা পেয়েছিল ওরা, যেদিন একটা রাক্ষস ওদের জানিয়ে দিয়েছিল হিঁদু-মুসলিমে ঊঢ়ি হয় না। তবু একসাথে রয়ে গেলো ওরা, আলাদা আলাদা ছাতের তলায়। ওদের সন্তানের নাম রেখেছিলাম আমি। কবীর।
ঋ -- ঋতুপর্ণ ঘোষ। ছেলেবেলায় ওর ছবি দেখে ইস্কুলে গিয়ে গল্প করতেই, অঙ্কে একশো পাওয়া ভ্রু-কুঁচিয়াল বন্ধুগুলো জিজ্ঞেস করেছিল: ওর ছবি দেখতে যাস, বাবা রে! তোদের (‘তোদের’ মানে, আমাকে আর দিদিকে) মা-বাবা এলাউ করে? জানিস না, ও একটা লেডিস! ঋতু যেদিন ফিরে আসবেনা জানলাম, ট্রেনের ভেতর। দলা পাকানো ব্যথা। গলার কাছে। দেখলাম, সেই বন্ধুগুলো বাংলা সিনেমার বড় ক্ষতি হয়ে গেল লিখে স্ট্যাটাস আপডেট করেছেন। সেইদিন থেকে ঘরে-বাইরে ইউরিনালগুলোতে ওদের অবয়ব ভেবেছি।
ঌ -- এই ঌ-এর সাথে কিছুদিন আগে ‘ব্যথা’ নিয়ে তুমুল হল। চলনে বলনে দেখনে লিবার‍্যাল, শুধু মননে একটু ঐ হুঁ হুঁ বাওয়া গোছের। তাই জিজ্ঞেস করে বসে- অমুকের তমুক ধারা লেখা কিভাবে পত্রিকায় ছাপা হয়? গুরুগিরির অভ্যেসটা বোধ হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একটা কুফল।
এ -- ‘একটা ছেলে’- সাহানা’র গলায় এই গানটা প্রথম শুনেছিলাম আমারই কোন একটা জন্মদিনে। তখন আমি শান্তিনিকেতনে। এই গানটার সাথে দীপান্বিতা একখানা বড়সড় চিঠি লিখেছে। সেটা পড়ে মোদ্দা কথা যা বুঝলাম, ‘কবিতার চচ্চড়ি’ ভেঙে যাওয়ার জন্য আমি, একা আমিই দায়ী। আরও লিখেছিল, আমরা আর যাই করি না কেন, ই-মেলে এই গান দেওয়া-নেওয়া যেন না থামাই। আজকাল একটা ছেলে আর ই-মেলে গান পায় না, পাঠায়ও না। কবিতার চচ্চড়ি নিয়ে আজকাল রিপোর্ট করে না কোনও খবরের কাগজ।
ঐ -- ঐ মেয়েটা বলেছিল, ‘ফিরবো’ পয়গম্বর হয়ে। ফেরত দেবো রেখে দেওয়া নীল জামাটা।
ও -- ও আজকাল কোথাও বেড়াতে গেলে, আর জানতে পারি না। দুম করে একদিন এস-এম-এস করে বসি, আজ তোদের পাড়ায় এসেছি, একজনের ইন্টারভিউ নিতেআপিস ছুটি হলে জানাস, বিকেলে। যদি ব্যস্ত না থাকিস, তবে.. ‘আমি কলকাতায় নেই। এই তো, হাফলঙে নামলাম এখুনি।’ ভেবেচিন্তে আজকাল সারসংক্ষেপ লিখি রাজনৈতিক কবিতারডাকনাম বদলে যেদিন ভালো নাম ফিরে আসে, বুঝে নিই- দূরত্ব আর আমাদের নিঃশ্বাস পরিমিত নয়। 
ঔ -- যেখানে তোমার ঔরসজাত সন্তানও আমারই সন্তান, সেই পৃথ্বীটার স্বপ্ন দেখি।

ব্যঞ্জনব্যথা ---
ক -- ক(এক) – কলকাতা। ফিরে আসবো। এখানেই। ব্যথা যতই লাগুক। এই কলকাতাকে চিনতে, জড়িয়ে ধরতে, ভালোবাসতে শিখেছি একজনের চোখ দিয়ে। নাম, মৃণাল সেন।
      ক(দুই) – কৃষ্ণা সোমানজানুয়ারি ছয়, ’১৫। শ্যাওলা মেখে ব্যথায় ডুব দিল ফড়িং, ট্রাম ডিপোর দেওয়ালে।
আমার  প্রাণের ’পরে চলে গেল কে
বসন্তের বাতাসটুকুর মতো।
সে যে   ছুঁয়ে গেল, নুয়ে গেল রে--
ফুল     ফুটিয়ে গেল শত শত।
সে      চলে গেল, বলে গেল না-- সে     কোথায় গেল ফিরে এল না।এখনো অফিস যেতে যেতে মনে হয়, এই বুঝি একটা হলুদ ট্যাক্সি এসে দাঁড়াবে। ‘উঠে এসো’।
খ -- খড়দা। ভালো নাম খড়দহ। অলি-গলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ব্যথা। আমার উধাও হওয়া কলতলায় দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করছিল অনীক--‘তোমার প্রিয় সিঁদুর, আমার প্রিয় রক্ত/তীব্র ঘন মিল, একই রঙের ভক্ত’ওর লেখা কবিতার একটা সংকলন বের করব, কথা চলছে জয়ির সঙ্গে। কি করে একটা মানুষ বাদল সরকার আর হ্যারি পটার দুটোই সমান তালে উপভোগ করতে পারে- সেটা অনীককে দেখেছিলাম। অনীক বড় হুড়োতাড়ায় চলে গেল।
গ -- গান এবং গান। ছেলেবেলায় রবীন্দ্র, নজরুল আর হারমোনিয়াম নিয়ে সংসার। দিদি গানের পরীক্ষায় ডিস্‌টিঙ্কশ্যন পেয়ে পাশ করেছিল। আর এই শর্মা, ভীষ্মলোচন হয়েই কাটিয়ে দিল পঁচিশটা গ্রীষ্ম। হারমোনিয়াম একদিন গিয়ে উঠল আলমারির মাথায়। সুমন চট্টোপাধ্যায় নামের একটা ব্যাপার ঘটে গেল ইতিমধ্যে। গ-এ গীটার এলো। সেখানেও ফাঁকিবাজি। তেত্রিশ বছর বয়সের আগে বোধ হয় গীটারটাও পুরোপুরি শেখা হবে না।
ঘ -- ঘেউ ঘেউ। মার্লি অ্যান্ড মি। একটা হলদে ফ্রেমে সূর্যাস্তের গন্ধ। মার্লি-কে জন গ্রোগান (ওয়েন উইলসন) বলছে- hey so, you’re gonna tell me right? When it’s time? Because I don’t wanna make that decision on my own. So you just let me know when you’re ready, okay. পকেট, আমার বন্ধু ছিল। আক্ষরিক অর্থে যাকে দাঁত চিপে আমরা bitch বলে থাকি। ‘বন্ধুতা’র অর্থ ঐ bitch-টার চেয়ে ভালো আর কেউ জানত না। না, ও আমার পোষা কুক্কুরী ছিল না। ঘরের আশেপাশে থাকত, এদিক ওদিক ঘুরত। খাওয়ার সময় ঠিক চলে আসত। আমার বাই-সাইকেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড় লাগাত প্রত্যেক সকালে। যেদিন ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরতে একটু দেরি হতো, দূর থেকে দেখতে পেতাম- পথ চেয়ে বসে আছে পকেটটা। একদিন সেও ঠিক কেটে পড়ল নিজের সময় মতন।
ঙ -- বাঙ্গালী’র চেয়ে বাঙালী বড় প্রিয়। কেবল ঙ-র জন্যই মনে হয়, বাঙ্গালীপনার প্যাঁচপয়জার কমে যায় বাঙালীতে এসে। ঙ-কে চিরকাল হ্যান্ডেল উইথ কেয়ার করেছেন যারা, তারা বুদ্ধিমান। চালাক নন।
চ -- চশমা। বড় কালো ফ্রেমের চশমা। চশমার সঙ্গে ঘর করছি ছেলেবেলা থেকে। এক খাটে শুয়েছি। কেউ একজন হারিয়ে গেলে, একে অপরকে খুঁজে খুঁজে হন্যে হয়েছি। মদ্যপান করে ওর ভরসাতেই এখনো ঘরের তালাচাবি হারিয়ে ফেলিনা। দূর থেকে বাসের নম্বরটা এখনো ও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। যেদিন চলে যাব, ধূপ-ধুনো না হলেও চলবে খাটিয়ার চারপাশে। কেউ যেন আমার চশমাটা চোখে পরিয়ে দেয়, ব্যস্‌
ছ -- ছোঁয়াছুঁয়ি খেলাটা একসময় হতো, বয়স খুবই কম তখন। মা ব্যতীত অন্য কোন মেয়ের স্তন অনুভব করি প্রথম। চৈতালীদি বলেছিল, কাল থেকে তুই আর খেলবি না। লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়েছিলাম। পরদিন ডেকে কমলা কাঠির আইসক্রিম খাইয়েছিল।
জ -- জলের মধ্যে এক ধরণের মায়া আছে। এখনো জলে নামলে ‘ফাইট কোনি ফাইট’ শব্দটা ভনভন করে কানের কাছে। প্রত্যেকের জীবনে ক্ষিদ্দা থাকে না। সেদিন শাশ্বত’দা কথা প্রসঙ্গে জানাল, ষোলো বছর আগের এক বসন্তোৎসবে, ও একা বসে পুকুর পাড়ে। বন্ধুরা রঙ মেখে ওর সামনে দিয়ে চলে গেল, যেন ও কোনো ভিন্‌ গ্রহের জীব। অনির্বাণ চক্কোত্তির (অনির্বাণ) কবিতার একটা লাইন মনে পড়ছে--- ‘মধ্যিখানে জলে/ছায়াটি টলটলে/দিনের মতো পোড়ে/জীবনটুকু ধরে’।
ঝ -- ঝাউপাতা। দেখো তো, সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়ো নি তো? শাসকের প্রতি তোমার আর কিছু বলার নেই তবে?
ঞ -- একটা রাত্তির ঠাঞি চেয়েছিলাম তার কাছে। কেবল একটা রাত্তির। ঘরের চাবিটা রেলগাড়িতে হারিয়ে ফেলে রাতদুপুরে পৌঁছেছিলাম শান্তিনিকেতন। ভেবেছিলাম, বন্ধু তো আছেই। মাথা গুঁজে দেওয়া যাবে নিশ্চয়ই। উল্টে বন্ধুই মাথা গুঁজে বলেছিলেন- দাঁড়া, অমুক হোটেলের টেলিফোন নম্বরটা বোধহয় দাদার সেলফোনে আছে। এই কথাটুকু বলার পর বন্ধু ঘরে ঢুকলেন। তারপর থেকে কোনদিন আমাকে চাক্ষুষ করেন নি আমার বন্ধু। ঠাঞি, একটা বিপজ্জনক শব্দ।
ট -- টগর। কলতলার একপাশে অবহেলায় ছিল। যত্ন করতে হয়নি। যে মেয়েটি বলেছিল, তুমি যত্ন করতে জানো না, তারও ডাকনাম ছিল টগর। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে নৌকায় চড়তে চড়তে তাকে হেমন্ত মুখুজ্যে শুনিয়েছিলাম হেঁড়ে গলায় ‘মনে কোরো আমি এক মৃত কোন জোনাকি/সারারাত আলো দিয়ে জ্বললাম/ ... দেখো না গো চেয়ে তুমি আনমনা চরণে কোন ফুল ভুল ক’রে দললাম/চললাম’
ঠ -- ঠাকুমা। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলে ভাগের মা গঙ্গা পায় না, এটা সত্যি। ঠাকুমা যখন আসতেন, মা এটা-সেটা দিয়ে দিতেন পুঁটলিতে। একবার আমার প্রিয় গন্ধওলা একখানা ধূপকাঠির বাক্স ঠাকুমার হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন মা। আমি তখন বেশ ছোট। সাদা থান টেনে রেখেছিলাম, বলেছিলাম ওটা তুমি নেবে না। ওটা আমার। ঠাকুমা মা’কে বলেছিলেন- উনি ফিরে এসেছেন। মনে হল যেন আমায় সাদা থান পড়তে বারণ করছেন। ‘উনি’ সম্পর্কে আমার ঠাকুরদা। বাবা বলেন, একটা বট গাছ একটা রাতের ঝড় সহ্য করতে পারেননি। ঝড় এলো, গোপালপুরের চক্কোত্তি পরিবারটা আজ দ্বীপপুঞ্জের মতো দেখায় এয়ারবাস থেকে।
ড -- ডগলাস। ডগলাস ডি সিলভা। পজিশন- মিডফিল্ড, ক্লাব- ইস্টবেঙ্গল, পরে মোহনবাগান। আমার কৈশোরের প্রেম। অঙ্কের ক্লাস কামাই করে আসিয়ান ফাইনাল দেখছি। দেখছি, ভারতের পতাকা গায়ে জড়িয়ে ব্রেজিলের বিচ্ছু এক গাল হাসছে। ডগলাস সম্পর্কে কথা বলতে গেলে সুভাষ ভৌমিক আজও উত্তেজিত হয়ে পড়েন। একটাই কথা ওর, কলকাতা ফুটবলে ডগলাস যতটা দিলো, আমরা ফেরত দিলাম কই?
ঢ -- ঢাকা আছে যেসব ক্ষত। জাগরীর আকাশটা যখন কমলা রঙের হয়ে যায় ভোর চারটেয়, আমার ঢাকা যেতে ইচ্ছে হয়। ঢাকায় বৃষ্টি থাকে। ওর জন্মদিনে জিজ্ঞেস করলাম, বল তোর কি চাই? উত্তর দিল- সব চাই। তোর। দে। মজা করলাম। সিরিয়াস আমি- বল না, কি চাই! সেটাই পাঠাবো। বৃষ্টি- শোনো, এই দ্যাশে থাকলে পুরা উশুল করে নিতাম। সুমনের গান হচ্ছে আমাদের ব্যাকগ্রাউন্ডে--- ‘মৃত্যু এসে ডাকলো যখন, আমি তখন অনেক দূরে তোমার থেকে/মরবো তোমায় জড়িয়ে রেখে/..আমি তখন চাইছি তোমায় আঁজলা পেতে/আদর খেতে আদর খেতে’। কলকাতা থেকে ঢাকা, কতটুকু আর পথ? বাসে উঠে..তবু আসিস না আমার দ্যাশে।
ণ -- সাহেবী কায়দায় পর্ক খুঁচানোর সময় কবীর সাহেবের আমেরিকা প্রবাসী বাঙালীর গানটা যেন গুনগুন করি মনে মনে। ‘পাখির মতো সকালটা আজ বড় দোটানায় ফেলেছে/বুকের ভিতর যত কথা ছিল তারা ব্যাকরণ ভুলেছে/ষত্ব-ণত্ববিধিতে সিদ্ধ বাঙালী/আজ দয়ার দুয়ার কাঙালী’
ত -- তোমার বুকে যতবার, রেখেছি হাত। ছেলেবেলার দোহাই, সত্যি বলছি। আমি আমার মা-কেই খুঁজেছি।
থ -- এখনো অব্ধি মদ্যপান করে বমি করেছি একবার। জন্মদিনে, সে চার বছর আগের কথাসস্তার হোটেলে ছোট্টখাট্টো ঘর। তাতে বন্ধুসংখ্যা আটসকাল থেকে খালি পেট। দুপুর থেকে ভর্তি মাথা। মাথা ভর্তি ছাতার ব্যথা ...এবং সন্ধ্যে নাগাদ মাথার উপর চড়ুইপাখির কুচুত-পুচুত, ব্যস...তারপর হড়হড় বেয়ে ও...য়া..ক। ক্যাটওয়াক করে গেলাম স্নানঘরে। পিছন পিছন এল একটি মেয়ে। ঝর্ণা থেকে ঝরঝর আরাম স্নানঘরের দরজা বন্ধ হল। সে মাথায় হাত রাখল। যেটুকু বাকি ছিল, উগড়ে দিলাম ধবধবে পোর্সেলিনে। ভেবেছিলাম, একটি অনবদ্য চুম্বন আসবে এইবারএসেছিল, সপাট একখানা থাপ্পড়। তারপর থেকে আর কোনো মদ্যপানে বমি হয়নি। থাপ্পড় খাওয়া, তাও না
দ -- দাম্পত্য। শক্ত মানেটা বুঝতে চাই না।
ধ -- ধর্ম একটা খুন করে বিশ্বাসপাড়ার অন্ধকার গলি দিয়ে কেটে পড়লচিৎকার করে বলে গেলো– সবকিছুর জন্য তুই দায়ী। দায় বয়ে নিয়ে চলেছি আজও। গোলদাররা নাকি মুসলিম! জল-টল খাস নি তো বাছা? খেয়েছি। গোলদার বাড়ী আমি আবারও যাবো বড়দা। লেদারের ভালোবাসা পিঠে রঙ চড়াচ্ছে। মণি গোলদার আর আমি নিস্তব্ধ জলের কাছাকাছি বসে থাকি সারা রাত। প্রলেপ লাগিয়ে নিওন নেভে। শোক পালন করে শহর। কলকাতা একটা মেগা সিটি হয়েছে, ঐ দ্যাখো। তালিয়া তালিয়া মিত্রোঁ।
ন -- অরুন্ধতী, বহুদিন অসময় কাটাইনি। আগামী ডিসেম্বরে কিছু মৃদু হাওয়া পড়ে থাকবে পউশ-নাগরদোলায়। উচ্চতা তুমি ভয় পাও না, আমি পাই। বিশেষত বজ্জাত চাঁদ যখন ধাওয়া করে, নামতে নামতে। অরুন্ধতী, বহুদিন জ্বরের ঘোরে ঘরভাঙা হয়নি।
প -- পাগল না পেট খারাপ যে, ভালোবাসো এত! একটাও না, আমি পাহাড় ভালোবেসে। পাহাড় হয়ে যাবো।
ফ -- ফালতু। ফালতু ছেলে। মেট্রোয় প্রেম এলে বিছানায় যায়। -তারপর? ফিরে আসে না। -তবে! মিনি-তে এলে শ্মশানে যায়। -মানে? সে ও ফিরে আসে না।
ব -- ব(এক)- বাবা। ছেলেবেলায় অঙ্ক কষতে বসে ঢুললে বিরক্ত- যাহ্‌ যাহ্‌ গিয়ে শুয়ে পড়। মা-কে বল খেতে দিয়ে দিতে। উফ্‌ এই কথাটুকু শুনলে মনে হতো জীবন ধন্য। বড়বেলায়- কি রে, ভোর হয়ে গেল তো বাবিন! আলো নেভাবি নে?  
     ব(দুই)- বইমেলা। কিংশুক, আমার চেয়ে বয়েসে দু-মাস কম। বইমেলায় পোর্ট্রেট বানায়। আর মল্লিকা, অনুভূতি হতে চেয়ে.. শাড়ি গুছিয়ে হাসি হাসি.. মোড়ায় ব’সে চিরুনি চালায়।
ভ -- ভালোবাসা। চালচুলোহীন সে ভালোবাসা। আলোর মতন ভাষা। ভেসে যাই একা একাই টোটোপাড়ার দিকে। ভেবেছিলে তোমার সাথে নামছি আমি মহুয়া খেতে। হলদে আলোর প্রেমে নেমেছিলেম। পাথরের পাশে, লুকিয়ে।
ম -- মা। পৃথ্বীর গভীরতম শব্দ এটা। নাভিতে তেল মালিশ থেকে মাথায় ধান-দুব্যখুন্তির বাড়ি থেকে পকেটে কন্ডোম। যে ক’টা রাত ঘর ফেরা হয়নি, পরদিন সকালবেলায় নিজের ছায়া দেখে মনে হয়েছে- একটা গাছ ওর উপড়ে যাওয়া শেকড়টাকে নিয়ে ঘষটাতে ঘষটাতে কালো পিচের রাস্তায় হেঁটে চলেছে জলের সন্ধানে। ঘর ফিরলে মা আর জিজ্ঞেস করেন না- জল দেবো একটু?
য -- যাপনে যতটুকু বিশ্বাস রাখি, জীবনে ততটা নয়। এই মুহূর্তটুকু চেটে নিচ্ছি আরশোলার মতো। এঁটোকাঁটা আছে যত।
র -- রাখাল সেজে পার পাবি নে। আমি কিন্তু খুব গায়ে পড়া টাইপ মেয়ে। আমারও একটা তৃষ্ণা আছে। বুকে মাথা রেখে শোবো একদিন। ব্যস্‌। আর কিছু না হলেও চলবে। টেক্‌ ওয়ান ওকে শটতোকে বিয়ে করতে পারবো নাপারবো না। প্রত্যাখ্যান করার সাথে সাথে নিজেও পুড়ছি। ভালোবাসা রাখা আছে লাল রঙের ভদকার ছিপিতে। দুটো চেয়ার পেতে বসবো না হয় সমুদ্রের সামনে। কাট্‌। হল না, হল না। লাল রঙ, ভদকার ছিপি- এসব কোত্থেকে এলো? স্ক্রিপ্ট পড়ো নি ঠিক করে!
ল -- লোলিটা। খুব কেঁদেছিলাম প্রথমবার পড়তে পড়তেকেন, কে জানে! তিন নম্বর স্ক্রীন অ্যাডাপ্টেশনটা করতে চাই। সিরিয়াসলি। আর প্রোফেসর হামবার্টের চরিত্রে অঞ্জন দত্ত। লোলিটার চরিত্রটা করার মতো কেউ নেই টালিগঞ্জেঅতএব, পয়সার ঝক্কি। খোঁজো খোঁজো। স্বপ্ন দেখছি না তো! উচ্চতা মারাদোনার চেয়ে বেশি তো নয়। আর আমার কোনো হ্যান্ড অব গড নেই। ভয় হয়।
শ -- শান্তিনিকেতন। লেখা শুরু করলে থামতে পারবো না। অতঃপর গুডস্‌-ট্রেন, টয়-ট্রেন হতে চাইবে। দেওয়াল ছেয়ে যাবে ‘বাহিরে ঝুঁকিবেন না’ চিহ্নে। অপরাহ্নে পৌঁছে যাবো ব্যান্ডেল। সেখান থেকে হাওড়া-মালদা আন্তঃনগর এক্সপ্রেস। গোধূলিলগ্নে কিশোর শরীরে ফিরে আসবে রোমাঞ্চকর অনুভূতি। রেল ষ্টেশনে নামার মুহূর্তে পত্রলেখার মনে পড়ে যাবে বিগত শতাব্দীর কথা। তার একখানা চারাগাছ অকালে প্রাণ হারিয়েছিল বোলপুর শান্তিনিকেতন ষ্টেশনের অদূরে। হৈমন্তী আসবে। পত্রলেখার হাত ধরবে। বলবে, বাবা। চলুন। তপস্বী আপনার সাথে সাক্ষাতের জন্য অধীর আগ্রহে রয়েছেন। পত্রলেখা ধীরে ধীরে রেল ষ্টেশন হতে বাইরে আসবে। দেখবে- টাউন, সিটি হয়ে গ্যাছে। দেওয়াল ছেয়ে আছে ‘নাগরিক ক্লান্তিতে’।
ষ -- ব্যথা নেই, নেই করে যতই আওয়াজ তুলি না কেন, এখন দেখছি ব্যথার আয়োজন অনেকটা ষাঁড়ের চেহারার মতো ঠেকছে। এতো কিছু ছিল তবে?
স -- স(এক)- এই সময়ের শব্দতলায়। তলিয়ে গেলো। সেই কথাটা। বুঝতে হলে কথার মানে, চেনা পথের বাইরে চলো। মৌসুমী ভৌমিক একটা বিস্ফোরণের নাম।
      স(দুই)- সুতপা সেনগুপ্ত। ‘স্ত্রীর পত্র’ হাতে তুলে দিয়েছিলেন এক বান্ধবী। কবিতা লেখার সাহস জুগিয়েছিল ঐ বইটা। এই কথা যেই না বলেছি এক কবির কাছে, ব্যস্‌। রেগেমেগে বললেন- সুতপা-কে এভাবে তেল দাও নাকি তুমি! কবির নাম বললে আর একটা হিরোশিমা হতে পারে।
হ -- ‘হালার মাছ ধইরা জুত নাই’মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। গৌতম ঘোষ। রাইসুল ইসলাম। ভারত বাংলাদেশ। আজ আমরা ক্রিকেট নিয়ে ঝগড়া করি। সত্যি, একটা দেশভাগ আমাদের কিস্যু শেখায় নি। আরও চাই। ভাগ হতে হতে.. হতে হতে.. অনেক কিছু শিখে যাবো।  
ড় ঢ় য় -- একেকটা অসুখের মতো। ওষুধের গন্ধ পাই ওদের আঙুলে। হুগলী ঘাটে একা বসে থাকলে ওদের একেক জনকে সিনিয়র সিটিজেন মনে হয়। রূপোলী সেতুর উপর দিয়ে ঝমঝম শব্দে চলে যায় অথর্ব রেলগাড়ি। ব্যথা পায় না কেউ। ব্যথা দেয় না কেউ। দৃপ্ত সিংহ রায় বাদাম ভাজা খেতে খেতে মরে যায়। স্বয়ংসিদ্ধা বাড়ি ফেরে ক্লান্ত পায়ে।| |

Comments