শ্রাবণ, বাইশ -অংশুমান।







দিনটা বাইশে শ্রাবণ। সন্ধ্যেবেলা গানের রিহার্সাল শেষ করে সবাই বেড়িয়ে পড়লো। না রবীন্দ্রগানের নয়। তবে এই দিনে মাথার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঘুরে বেড়ায়। অন্যদিন যে ঘোরেনা এমন নয়। বাকিরা যে যার মতো বাড়ির পথে রওনা হলে সুমন্ত আর বিক্রম বড় রাস্তার মোড়ে এসে পৌঁছল যখন, তখন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। ছাতা নেই। বাইশে শ্রাবণ একটু বৃষ্টি ভেজায় যায় এরকম ভাবনায় দুজনেই রাজি। ডানদিকের মদের দোকান প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখে।

- বিক্রমদা ছোটো, দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।

- চল চল।

পাওয়া গেল রাম। এক বোতল জলও কিনতে হবে। বৃষ্টির জলেও একসময় মদ খেয়েছে। আজকাল বৃষ্টির জলে যথেষ্ট ভেজাল। মিনারেল ওয়াটারের বোতল এলো। দু'টো প্লাস্টিকের গ্লাস।

- রবীন্দ্রনাথ বোধহয় রাম-টাম খেতো না।

- না ও যা জিনিস, সবই খেতো মনে হয়।

- জিনিস তো বটেই নাহলে আর বলে ওয়ান কোয়ার্টার জলে থ্রি কোয়ার্টার হুইস্কি!

‌- হ্যাঁ, দম ছিল মাল খাওয়ার নিশ্চয়...

- যাকগে আজ আর মৃত্যূদিনে মাতাল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। শুনতে পেলে খিস্তি করবে।

- হ্যাঁ ওপর থেকে নিচে কম কিছু তো এতদিনে দেখেনি! যত পাগলামি তত কেচ্ছা, গালাগাল, খিল্লি, সবই।

একটা শেড এর নিচে দাঁড়িয়ে প্লাস্টিক গ্লাসে রাম ঢালা হল। জয়গুরু বলে বটম্স্ আপ ও হয়ে গেলো। বৃষ্টি ক্রমশ বাড়ছে। দুজনকে দুদিকে ফিরতে হবে। একটু নেশা হলে বাইশে শ্রাবণ যেন অজান্তেই বিষাদের মতো ঘিরে ধরছে। রাত প্রায় এগারোটা। আলো ফিকে। মানুষ কম।

- বাঙালিরা রবীন্দ্রনাথকে যতটা ক্রেজি। বাইরে বোধহয় শেক্সপিয়ার ছাড়া কাউকে নিয়েই অত হ্যাংলামি নেই।

- কী জানি থাকতেও পারে! ঢাল আর এক পেগ নাকি?

- হ্যাঁ। এখানে তো রবি ঠাকুরের সংক্রান্ত সবই একটা ব্যবসার জন্ম দিয়েছে। বৌদিবাজি নিয়েও বই ফই করে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

- হ্যাঁ এই রাস্তা ঘাটে দিনরাত গান, কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথ আর কি!

পঁচিশে বৈশাখের সাথে যতটা আবেগ জড়িয়ে থাকে। তার থেকে ঢের গভীর লাগে বাইশে শ্রাবণ। কথা বার্তা এভাবেই নেশার সাথে বন্ধুত্ব রেখে চলছিল। কান্নামাখা, সোডিয়াম-আলো মাখা বৃষ্টিও অংশগ্রহণ করছে এমন সময় একটা বাইক এসে থামলো। না, পুলিশের নয়। ডিকি থেকে একটা হুইস্কির বোতল আর স্টিলের গ্লাস নিয়ে ওদের পাশে এসে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়েই প্রথমে ফোন চাইলো। একটা কল করা জরুরী। রবীন্দ্রনাথ ভুলে এই লোকটার সাথে শুরু হলো কথোপকথন। লোকটা সেলসে চাকরী করেন। ফোনটা নাকি বৃষ্টি ভিজে বন্ধ। বেশ জীবনের লড়াইয়ের মধ্যে আছেন বোঝা যায়। বোঝা যায় বাড়িতে অসুখ কাঁধে নিয়ে কোনো স্ত্রী আছেন বা বেকার সন্তান। যায় হোক রোজ নাকি তার কাছে একটা হুইস্কির নিপ থাকে। বাড়িতে খেলে বৌ বকে বলে রাস্তার ধারে বাইক ঠেকিয়ে স্যাট করে মেরে বাড়ি চলে যান। রোগা। চুল কম মাথায়। দাড়ি অল্প, কাঁচা-পাকা। এরপর জল চাইলেন। সুমন্ত আর বিক্রম তাদের জলের বোতলটা বাড়িয়ে দিল। লোকটা মদ ঢালতে ঢালতে ঢেলে ফেলছে সংসার, ঢেলে ফেলছে সংগ্রাম, ঢেলে ফেলছে জীবন, আতিথেয়তা। এই ধরনের সাহায্য করতে এরা ভালইবাসে তাই লোকটা 'বিরক্ত করছি কিনা' বা 'কিছু মনে করলেন কিনা'র উত্তরে ঢের ভালোবাসা ফেরত পেয়ে যাচ্ছে। ভাগ করে নিচ্ছে বাইশে শ্রাবণের বিষাদ।

- সুমন্ত চল। আমাদের বেরোতে হবে। দাদা এবার বেরোব আমরা।

- হ্যাঁ চলো। আপনি বাকি জলটা রেখে দিন।

- অনেক ধন্যবাদ আপনাদের।

- আরে না না মদ খেতে জল দিলাম এ তো পূণ্যের বিষয়। এরকম করে আপনি বা কেউ একদিন আমাদের

দেবে-টেবে আর কি!

- তবু ধন্যবাদ তো দিতেই হয়। বেশ আবার দেখা হবে না হয়।

- বেশ। এমনি করেই তো চলছে-টলছে... বাইশে শ্রাবণে আপনাকেই মনে রাখলাম।

- আপনাদের নাম কী? কী করেন খুব একটা তো জানা হলো না।

- আমরা এইভাবেই এটা ওটা করে বেঁচে আছি আর কী। আমি বিক্রম আর ও সুমন্ত। ভাই হয় আমার।

- আচ্ছা।

- তাহলে দাদা আমরা এগোই। আপনার নামটা?

- রবীন্দ্রনাথ।


রবীন্দ্রনাথ.... বৃষ্টি বেড়ে এলো... আরো বেড়ে এলো... আরো... আরো বেড়ে এলো... সারারাত..





---

Comments

Post a Comment